রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ১০:৪১ পূর্বাহ্ন

কভিডের চেয়েও কঠিন পরীক্ষা: ২০ বছর পর বিএনপির ৯.৩ লাখ কোটির মেগা বাজেট

স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা, অর্থনৈতিক ডেস্ক ॥
বিগত কভিড-১৯ মহামারির চরম সংকটকালীন সময়কেও যেন হার মানিয়েছে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। মহামারি চলাকালীন সময়েও বিশ্ব স্থবির থাকলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চাকা একবারে থেমে যায়নি। কিন্তু বর্তমানের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একদিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা, অন্যদিকে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ পরিস্থিতির মতো বৈশ্বিক সংকট- সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে।

এই চরম ও বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেই নতুন সরকার গঠনের মাত্র তিন মাস পার করে চতুর্থ মাসে পা দিতে যাচ্ছে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার। আর এই স্বল্প সময়েই ২০ বছর পর দেশ পরিচালনার দায়িত্বে এসে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এক বিশাল ও চ্যালেঞ্জিং বাজেট প্রণয়নের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে দেশের ইতিহাসের রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতি নিয়ে প্রথমবারের মতো আনুমানিক ৯ লাখ ২০ হাজার থেকে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার খসড়া তৈরির কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে তা চূড়ান্ত করার জন্য নানা পরিমার্জন ও কাটাছেঁড়া চলছে। সীমিত সম্পদ নিয়ে সমতার বাংলাদেশ গঠনে বিএনপি সরকার বদ্ধপরিকর উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য জনগণের কাছে কিছুটা সময় চেয়েছেন।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ভর্তুকির দোলাচল
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক সংকটের কারণে বিশ্বজুড়েই প্রবৃদ্ধি কমবে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও; চড়া মূল্যস্ফীতির চাপে পিষ্ট হচ্ছে সব শ্রেণির মানুষ। একই সাথে বড় অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতির কারণে বাজেট বাস্তবায়ন পরিস্থিতি গতি হারিয়ে ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আপত্তি থাকা সত্ত্বেও দেশের মানুষকে স্বস্তি দিতে এবং পরিস্থিতি সামলাতে বাজেটে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়াচ্ছে সরকার।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিতর্কিত ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বহাল রাখার সিদ্ধান্তের কারণে এ খাতে সরকারকে বিশাল ভর্তুকি গুণতে হচ্ছে। পাশাপাশি নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি দিতে আমদানি পর্যায়ে করছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যা সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে ভর্তুকির চাপ আরও বাড়াবে। যদিও ইতিমধ্যে আইএমএফ-এর শর্তের চাপে পড়ে দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মাথায় সরকারকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে হয়েছে এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়াও চলছে, যা জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিয়েছে।

বিশাল ঘাটতি ও অর্থায়নের উৎস
আসছে অর্থবছরে সরকারের মোট আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিক বাজেটে ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎসের ওপর নির্ভর করতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১ লাখ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ এবং বাকি ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস (যেমন ব্যাংক ও অন্যান্য খাত) থেকে ঋণ হিসেবে নেওয়া হবে। উল্লেখ্য, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসেই সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে এবং রাজস্ব ঘাটতি ইতিমধ্যে ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

নতুন করজাল ও ধনীদের ওপর চাপ
রাজস্ব আয় বাড়াতে এবার সব অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে করের আওতায় এনে এক ছাতার নিচে গড়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক উদ্যোক্তাদেরও বছরে অন্তত একটি ন্যূনতম কর দিতে হবে। এছাড়া মোটরসাইকেল ও চার্জার রিকশার মালিকদেরও আয়করের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

বাজেটের অন্যতম বড় আকর্ষণ হতে যাচ্ছে অতি ধনীদের জন্য সরাসরি ‘সম্পদকর’ ব্যবস্থা। বর্তমানে উচ্চ সম্পদের ওপর প্রদেয় আয়করের ওপর ভিত্তি করে যে সারচার্জ নেওয়া হতো, তা তুলে দিয়ে সরাসরি সম্পদের মূল্যের ওপর কর আরোপ করা হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাব মতে, দেশে দেড় কোটি টাকার বেশি আয়ের প্রায় ৩০ হাজার করদাতা রয়েছেন। এই নতুন নিয়ম চালু হলে সরকার অতিরিক্ত ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের আশা করছে।

মধ্যবিত্তের স্বস্তি ও ব্যবসাবাণিজ্য চাঙা করার উদ্যোগ
ব্যবসাবাণিজ্য গতিশীল করতে এবং ব্যবসার খরচ কমাতে সব ধরনের করপোরেট কর কমানোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে নগদ অর্থপ্রবাহের চাপ কমাতে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (AIT) কমিয়ে পণ্যের ধরন অনুযায়ী ৩ বা ৪ শতাংশ করার পরিকল্পনা চলছে।

অন্যদিকে, সাধারণ ও মধ্যবিত্ত করদাতাদের স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা বর্তমানের সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হতে পারে।

কালোটাকা সাদা ও পে-স্কেলের চাপ
অর্থনীতির মূল স্রোতকে শক্তিশালী করতে পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের বন্ধ করে দেওয়া ‘কালোটাকা’ বা অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ পুনরায় চালু করার চিন্তা করা হচ্ছে। তবে এবার নির্দিষ্ট কম হারে নয়, বরং যে অর্থবছরে আয় গোপন করা হয়েছিল, সেই সময়ের নিয়মিত করহার পরিশোধ করে আইনি সুরক্ষাসহ সম্পদ বৈধ করা যাবে। এতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা অন্য কোনো সংস্থা উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে না।

এর পাশাপাশি, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত ‘নবম পে-স্কেল’ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। সরকারি কর্মচারীদের তুষ্ট করার এই পদক্ষেপে সরকারের খরচ এক ধাক্কায় ১ লাখ কোটি টাকার বেশি বেড়ে যাবে, যা বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়াতে পারে। ফলে প্রবৃদ্ধিসহায়ক বাজেট তৈরির চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেই সরকারকে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হচ্ছে।

মেগা এডিপি ও জনবান্ধব কর্মসূচি
চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সচল রাখতে প্রথমবারের মতো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা চলমান এডিপির চেয়ে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি।এজন্য জনবান্ধব কিছু কর্মসূিচ ইতোমধ্যে শুরু করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং খাল খনন। এ ছাড়া বাজেটে থাকবে আরও নতুন কিছু জনবান্ধব কর্মসূচি

অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ
সামগ্রিক এই পরিস্থিতি নিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন:

“আসছে বাজেটটা হবে নতুন এক প্রেক্ষাপটে জনপ্রত্যাশার, যেখানে প্রতিফলিত হতে হবে জনগণের স্বার্থ।”

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করে বলেন:

“অনেক দিন পর দেশের মানুষ ভোট দিয়ে একটি সরকার গঠন করেছে। ফলে এ সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। এজন্য প্রথম বাজেটের দিকে নজর থাকবে প্রায় সব শ্রেণির মানুষেরই।”

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের মতে, অতিরিক্ত করের চাপে শিল্প খাত যেন সংকুচিত না হয়, সেই ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে এই বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ। করকাঠামো স্থিতিশীল রাখা এবং কাঁচামালে অগ্রিম কর কমানোর উদ্যোগগুলো সফল হলে তা ব্যবসায়ীদের আস্থা ফেরাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com